প্রচ্ছদ > খেলা > ফুটবল

বাড়ি ফেরার সবচেয়ে দীর্ঘ ফ্লাইট

article-img

শেষ বাঁশি বাজবে। একজন জিতবেন। একজন হারবেন। একজনের বিশ্বকাপ বেঁচে থাকবে। অন্যজনের বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে সেখানেই।

ফ্রান্স কিংবা স্পেন। কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা লামিন ইয়ামাল। একজনের চোখে থাকবে আরও বড় স্বপ্ন। অন্যজনের সামনে অপেক্ষা করবে বাড়ি ফেরার সবচেয়ে দীর্ঘ ফ্লাইট।

বিশ্বকাপ থেকে বিদায় মাঠেই নিশ্চিত হয়। পরাজয়ের আসল যাত্রা শুরু হয় স্টেডিয়াম থেকে বিমানবন্দরের পথে।

স্কোরবোর্ডে তখনও ফলটি জ্বলতে থাকবে। বিজয়ীরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরবেন। গ্যালারির এক পাশে উৎসব। অন্য পাশে নীরবতা। কেউ মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকবেন। কেউ জার্সি দিয়ে মুখ ঢাকবেন। কেউ শুধু তাকিয়ে থাকবেন মাঠের দিকে।

হয়ত ফ্রান্স হারবে, এমবাপ্পে দাঁড়িয়ে থাকবেন কিছুক্ষণ। যে মানুষটির গতির সঙ্গে ছুটেছে একটি দেশের স্বপ্ন, তিনিই হয়ত সেদিন সবচেয়ে ধীরে হাঁটবেন ড্রেসিংরুমের দিকে।

অথবা হারবে স্পেন। ইয়ামাল মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়বেন। যে কিশোরের বাঁ পায়ে একটি দেশ নতুন যুগের স্বপ্ন দেখেছে, তাকেও বুঝতে হবে বিশ্বকাপ শুধু নায়ক তৈরি করে না। হৃদয়ও ভাঙে।

তারপর ড্রেসিংরুম। কেউ কথা বলবেন না। কারও বুট তখনও পায়ে। কেউ মাথা নিচু করে বসে থাকবেন। কোচ হয়ত কিছু বলবেন। সব কথা কি তখন কানে পৌঁছায়?

হোটেলে ফিরবেন ফুটবলাররা। ঘরের টেবিলে পড়ে থাকবে বিশ্বকাপের পরিচয়পত্র। ম্যাচের কাগজ। পানির বোতল। ব্যাগে ভাঁজ করে রাখা হবে জাতীয় দলের জার্সি। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে জার্সি একটি দেশের স্বপ্ন বহন করছিল, সেটিই তখন অসমাপ্ত গল্পের স্মৃতি।

পরদিন বিমানবন্দর। লাগেজ যাবে বিমানে। ফুটবলাররা বসবেন নিজেদের আসনে। কিন্তু কেউ কি সত্যিই ফিরতে চাইবেন?

বিমান আকাশে উঠবে। নিচে ছোট হয়ে আসবে সেই দেশ, যেখানে তারা বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন। জানালার পাশে বসে কেউ বাইরে তাকিয়ে থাকবেন। কেউ হেডফোন কানে দিয়ে চোখ বন্ধ করবেন। কেউ মোবাইল ফোন খুলবেন না।

সেখানে অপেক্ষা করছে হাজারো বার্তা। সান্ত্বনা। সমালোচনা। পরিবারের ফোন।

নিজের ভেতরে একটি প্রশ্ন—আরেকটু যদি পারতাম!

বিশ্বকাপ থেকে বাড়ি ফেরার ফ্লাইটের দূরত্ব মানচিত্রে মাপা যায়। তার দৈর্ঘ্য কিলোমিটারে মাপা যায় না। সেই যাত্রা দীর্ঘ হয় স্মৃতিতে।

একটি ভুল পাস। একটি মিস করা সুযোগ। একটি শট। একটি সেভ। একটি মুহূর্ত।

বারবার ফিরে আসে। বিমান সামনে এগিয়ে যায়। মন পড়ে থাকে পেছনের কোনো এক মাঠে। একসময় বিমান নামবে প্যারিস কিংবা মাদ্রিদে। বাইরে অপেক্ষা করবেন সমর্থকেরা। কেউ পতাকা ওড়াবেন। কেউ করতালি দেবেন। কেউ শুধু একবার দেখতে চাইবেন তাদের নায়কদের।

তারা বাড়ি ফিরবেন। সত্যিই কি ফিরতে পারবেন? বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়া একজন ফুটবলারের কিছুটা অংশ হয়ত সারাজীবন সেই মাঠেই থেকে যায়। শেষ বাঁশির কাছে। স্কোরবোর্ডের নিচে। সেই একটি মুহূর্তের কাছে। ফ্রান্স কিংবা স্পেন।

একটি দল সামনে এগিয়ে যাবে। অন্য দলটি উঠবে বাড়ি ফেরার বিমানে। বিমানটি হয়ত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছে যাবে।

কিছু পরাজয় থেকে বাড়ি ফিরতে কখনো কখনো একটি জীবনও কম পড়ে। সেটিই বিশ্বকাপের সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে ভারী এবং সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রা। বাড়ি ফেরার সবচেয়ে দীর্ঘ ফ্লাইট।